
ডায়রিয়া (Diarrhoea.)
ডায়রিয়া (Diarrhea) হলো এক ধরনের হজমজনিত সমস্যা, যেখানে একজন ব্যক্তির দিনে তিনবার বা তার বেশি পাতলা, পানিযুক্ত মলত্যাগ হয়। অনেক সময় এটা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়, আবার কখনও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবেও দেখা দিতে পারে।
এই পীডাটির বিষয় সম্পর্কে নতুন করে তেমন কিছুই বলার দরকার নেই, কারণ এটির লক্ষণাদি সকলেরই কিছু না কিছু জানা আছে। তবুও চলুন জেনে নিই এটি কি, কত প্রকার এবং এর লক্ষণগুলো কি কি হোমিও ১০ টি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধের ব্যবহার।
ডায়রিয়া কি?
তরল মল কখনও অল্প কখনও পুনঃ পুনঃ নির্গত হতে থাকলেই তাকে আমরা-উদরাময় বা ইংরাজীতে ডায়রিয়া বলি।
কেন হয় ডায়রিয়া?
ডায়রিয়ার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে, যেমন:
-
ভাইরাসজনিত সংক্রমণ (যেমন: রোটাভাইরাস, নরোভাইরাস)
-
ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ (যেমন: ই-কোলাই, সালমোনেলা)
-
জলবাহিত রোগ বা দূষিত খাবার খাওয়া
-
অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
-
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স (দুধ জাতীয় খাবারে অজীর্ণতা)
-
হজমে সমস্যা বা আইবিএস (Irritable Bowel Syndrome)
ডায়রিয়ার প্রকারভেদঃ
সাধারণতঃ আমরা ৪ প্রকারের উদরাময় অধিক দেখতে পাই:-
যেমনঃ
১। ইরিটেটিভ (Irritative)- অতিরিক্ত আহার, গুরুপাক উত্তেজক দ্রব্য আহার এবং বাসি, পচাদ্রব্য পানাহার ইত্যাদিতে এটি হয়।
২। ল্যায়েন্টেরিক (Lienteric)- এটি যাদের হয় তাদের সাধারণতঃ আহার করা কোনো খাদ্যের কোন অংশ বা কতক পরিপাক না হয়ে অজীর্ণ অবস্থায় মলের সাথে নির্গত হয়।
৩। কনজেক্টিভ (Congestive)- যাদের রৌদ্রে ভ্রমণ, অগ্নির উত্তাপে এবং পরিশ্রম ইত্যাদিতে শরীর গরম হয়, সেই সময় হঠাৎ সরবৎ, বরফ ও ঠাণ্ডা পানি পান করলে এবং হঠাৎ পেটে কোনও কারণে ঠাণ্ডা লাগলে বা হঠাৎ ঘাম বন্ধ হলে তাদের এই উদরাময় হয়।
৪। সামার ডায়েরিয়া (Summer Diarrhoea)- গ্রীষ্মকালে অত্যন্ত গরম পড়লে অনেক সময় অনেকের উদরাময় হয়।
তাছাড়া লিভারের ক্রিয়া ভালরূপ না হলে, ঋতু পরিবর্তন, জোলাপ নেওয়া, অন্ত্রে ক্রিমি, অন্ত্রে টিউবারকল (গুটী) এবং শোক, দুঃখ, ভয় ইত্যাদির কারণে ডায়রিয়া হয়ে থাকে।
লক্ষণঃ
১। ঘন ঘন তরল বাহ্যে অজীর্ণের কারনে হলে-পেটে বেদনা, পেটে কামড়ানি-ব্যথা, পেট ডাকা, চোঁয়া-ঢেঁকুর, টক-ঢেকুর, পেটফাঁপা, বুকজ্বালা প্রভৃতি উপসর্গ থাকে।
২। মলের বর্ণ হলুদ, সবুজ, সাদা নানা প্রকারের হয়।
৩। মলে-টকগন্ধ বা পচা দুর্গন্ধ থাকে, কখনও গন্ধ থাকে না, প্রতিবারেই বাহ্যের সময় গ্রস্রাব হয়।
৪। অম্লজনিত উদরাময় হলে উদরাময়ের সাথে টক-ঢেকুর, টক-বমি, বুক ও গলা জ্বালা থাকে, মুখের আস্বাদ টক বা তিক্ত হয়, পেট ডাকে।
হোমিও ঔষধঃ
সাধারণতঃ বয়স্ক ব্যক্তিদিগের উদরাময়ে-একোনাইট, নক্স, ইপিকাক, পলসেটিলা, চায়না, গ্যাম্বোজিয়া, এসিড-ফস, ফসফরাস, এলো, আইরিস, ক্রোটন, ইলাটিরিয়ম, পডোফাইলম, জ্যাট্রোফা, ল্যাকেসিস, কার্ব্বো, ভেরেট্রম ইত্যাদি ঔষধ লক্ষণ ভেদে ব্যবহৃত হয়।
ডায়রিয়ার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ হোমিও ঔষধের বর্ণনা দেওয়া হলোঃ
ডায়রিয়ার হোমিও ঔষধসমূহঃ
১। একোনাইটঃ শক্তিঃ 1X, 3X।
লক্ষণঃ
১। মল দেখিতে ঘোলানো তরমুজের পানির মত।
২। পিত্ত মিশ্রিত কিম্বা সবুজবর্ণ সেওলার মত।
৩। রক্তবর্ণ।
৪। পেটে খুব বেদনা এবং তার সাথে ছট্ফটানি, পিপাসা, দ্রুত নাড়ী, শীতবোধ, বমি গা বমি বমি ঘাম মৃত্যুভয়, বাহ্যের সময় মলদ্বারে গরমবোধ, বুকে পেটে বেদনা প্রভৃতি লক্ষণ থাকলে-১ম অবস্থায় একোনাইট প্রযোজ্য।
★★ ডায়রিয়ার ২য় অবস্থায় একোনাইটের লক্ষণসমূহঃ
প্রথম অবস্থার লক্ষণের সাথে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো বিদ্যমান থাকলে একোনাইট ঔষধটি ডায়রিয়ার ২য় অবস্থায় প্রয়োগ করতে হয়।
লক্ষণঃ
১। রোগীর পাকস্থলী হতে সমস্ত অনুবহানালী ও মুখ পর্যন্ত জ্বালা অনুভব করে।
২। অত্যন্ত পিপাসার সঙ্গে বমি করে।
৩। পানিপান করলেই বমি হয়।
৪। অত্যন্ত ছটফট করে।
৫। বেদনাশূন্য চাউলধোয়া পানির মত সাদা রঙের বাহ্যে হয়।
৬। মুখের চেহারা মরার মত বোধ হয়।
৭। ঠোঁট মুখ নীলবর্ণ বা কালীমাখা দেখায়।
৮। শরীর শীতল হয়।
৯। নাড়ী হাতে পাওয়া যায় না।
১০। অল্প অল্প প্রস্রাব হয় অথবা প্রস্রাব বন্ধ থাকে, তখন এটি-২য় অবস্থাতেও প্রয়োগ করা যায়।
★★ এটি প্রয়োগকালে সর্ব্বদা ছটফটানি, অস্থিরতা, মৃত্যুভয়, উদ্বেগ প্রভৃতি moral symptoms গুলির উপর দৃষ্টি রাখতে হবে।
২। নক্স ভমিকাঃ শক্তিঃ 3X, 6X, 30।
লক্ষণঃ
১। রাত্রি জাগরণ ও গুরুপাক দ্রব্য খাওয়ার পর পীড়ার উৎপত্তি।
২। বমি, কাঠ বমি।
৩। কোষ্ঠবদ্ধের পর উদরাময়।
৪। পেটে-কামড়ানি, খামচানি, চিবানো-ব্যথা।
৫। বাহ্যে পরিমাণে একটু একটু কিন্তু বারে অধিক হয়।
৬। প্রতিবারে বাহ্যে হওয়ার সময় মনে হয় যেন আর একটু বাহ্যে হলে ভালো হতো।
৭। বাহ্যে-পাতলা ও দুর্গন্ধ।
৮। রঙ-সবুজ ও কালচে, আম মিশ্রিত।
৯। প্রাতে ও আহারের পর পীড়ার বৃদ্ধি।
১০। রোগীর মেজাজ রাগী ও খিটখিটে।
৩। পলসেটিলাঃ শক্তিঃ 3X, 6X ও 30।
লক্ষণঃ
১। পলসেটিলার বাহ্যের রঙ-ঠিক হলদেও নয়, সবুজও নয়, অর্থাৎ মাঝামাঝি একপ্রকার মিশ্রিত রঙের কিম্বা পরিবর্তনশীল। প্রতি দুইবারে বাহ্যে-তাহার রঙ ও পরিমাণ কোনও বিষয়ে একরকম হয় না।
২। ঘৃতপক্ক দ্রব্য, পিষ্টক, পায়েস প্রভৃতি খেয়ে রোগের উৎপত্তি, পিপাসা থাকে।
৩। পেটে বায়ু জমে।
৪। যেসব দ্রব্য খেয়েছে তা যেনো গলা ঠেলে উপরে উঠে আসে।
৫। পেট খামচায়, ব্যথা করে, পেট গড়গড় করে।
৬। বমিতে শ্লেষ্মা অথবা পিত্ত উঠে-ভুক্তদ্রব্য উঠে যায়।
এটি স্ত্রীলোক ও নম্র স্বভাব ব্যক্তির পীড়াতেই অধিক উপকারী।
★★ যেখানে অপরিপাচ্য আহরীয় দ্রব্য বমি না হয়ে পেটে জমে থাকে সেখানে-পলসেটিলা।
★★ পালসেটিলায় বমি হয় কিন্তু ইপিকাকের মত অত গা-বমি বমি থাকে না।
★★ পালসেটিলার-জিহ্বা সাদা লেপযুক্ত।
৪। ইপিকাকঃ শক্তিঃ 3X, 30।
লক্ষণঃ
১। বাহ্যের রঙ প্রায় ঘাসের মত সবুজ, ফেণাযুক্ত, শ্লেষ্মা বা আমমিশ্রিত, লালার মত হড়হড়ে, কখনও রঙ হলদে বা কালচে রং ও হয়।
২। পেটে খুব কামড়ানি খামচানি ব্যথা, উদরাময়ের সঙ্গে বমি, গা-বমি বমি থাকে।
৩। যেখানে বমি হয়ে খাদ্য উঠে যায়, পেটে অত্যন্ত কামড়ানি বেদনা, সেখানে ইপিকাক উপকারী।
৪। ইপিকাকে অজীর্ণ খাদ্যদ্রব্যসমূহ সম্পূর্ণ বমি হয়ে উঠে যায়; তবুও পেটের বেদনার নিবৃত্তি হয় না।
৫। ইপিকাকের জিহ্বা প্রায় পরিষ্কার।
★★ আহারের অনিয়মে পেটের পীড়া হলে-পালসেটিলা ও ইপিকাক দুইটী ঔষধই উপকারী। উভয় ঔষধই চর্বিযুক্ত দ্রব্য, ঘৃতপক্ক, বরফ, ক্ষীর, মিষ্টান্ন, প্রভৃতি খেয়ে পীড়া হলে উপকারী।
৫। চায়নাঃ শক্তিঃ 3X, 6X, 30।
লক্ষণঃ
১। দুর্গন্ধযুক্ত তরল বাহ্যে, রঙ্ গাঢ় হলুদে, কিম্বা ফিকে হলদে।
২। বাহ্যের সঙ্গে আহারীয় দ্রব্যসমূহ অজীর্ণ অবস্থায় সম্পূর্ণটা নির্গত হয়।
৩। বাহ্যে-আহারের পর ও রাত্রিতে অধিক হয়।
৪। পেট ফাঁপে ও ফোলে।
৫। চায়নার পেটফোলা-বাহ্যে হলে, ঢেকুর উঠলে কিম্বা বায়ু নিঃসরণ হলেও কমে না বরং বৃদ্ধিই হয়।
৬। রোগী অত্যন্ত দুর্ব্বল হয়ে পড়ে, বাহ্যের পর ক্ষুধা হয়; কিন্তু যেমন আহার করে তেমনি বাহ্যে হয়।
৬। এসিড ফসঃ
লক্ষণঃ
১। অধিকবার অনেক বেশী বাহ্যে হয়; কিন্তু চায়নার মত রোগী দুর্ব্বল হয় না, বাহ্যে হইবার পূর্ব্বে পেট ডাকে, পেট ভুট্ ভুট্ করে, গড় গড় শব্দ হয়, পেটে বিন্দুমাত্রও বেদনা থাকে না। এটির রোগী আদৌ দুর্ব্বল হয় না।
৭। ফসফরাসঃ শক্তিঃ 6X, 30।
লক্ষণঃ
১। উদরাময় ক্রমশঃ কলেরায় রূপ নেয়।
২। বেদনা শূন্য উদরাময়।
৩। মলের রঙ-সবুজ, শ্লেষ্মা, বা আমযুক্ত তাহার সাথে অজীর্ণ খাদ্য, একপ্রকার তৈলাক্ত দ্রব্য কিংবা বাহ্যে-সাগুদানার মত সাদা সাদা হড় হড়ে পদার্থ বাহ্যের সঙ্গে নির্গত হয়।
৪। মলদ্বারে অবিরাম বাহ্যে ঝরে, রোগী শুয়ে থাকে ও বাহ্যে অসাড়ে চুঁইয়ে নির্গত হয়।
৮৷ এলোঃ
লক্ষণঃ
১। প্রস্রাবের সময় ও বায়ু নিঃসরণ হলে অসাড়ে বাহ্যে গিতি হয়। ফসফরাসে-মাছ বা মাংসধোয়া জলের মত বাহ্যেও হয়, ইহা বৃদ্ধ একসের ও প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির রোগের এবং রোগা লম্বা ধাঁচের ব্যক্তির পীড়ায় উপকারী। ইহার রোগ লক্ষণ-বামপার্শ্বে শুইলে বাড়ে।
৯। ক্রোটনটিগঃ
লক্ষণঃ
১। জলের মত তরল বাহ্যে নির্গত হয়, তবে ক্রোটনের বাহ্যে অনেক হলদে।
২। কখনও হলদে রঙের সঙ্গে যেন সবুজ রঙ মিশ্রিত থাকে, অথচ ঠিক সবুজ নয়।
৩। বাহ্যের পূর্ব্বে পেটে ব্যথা থাকে না, কিন্তু আবার পান আহারের পর এতে বাহ্যে ও বমির বৃদ্ধি হয়।
১০। পডোফাইলমঃ শক্তিঃ 3X, 30, 200।
লক্ষণঃ
১। বাহ্যে পরিমাণে অত্যন্ত অধিক বেগে নির্গত হয়।
২। রঙ-হলদে, ফিকে হলদে, বাদামি, ফিকে সবুজ, লাল হড় হড়ে ও আমমিশ্রিত।
৩। এতে রাত্রি ১২টার পর ও প্রাতঃকালে বাহ্যে অধিক হয়। তাছাড়া – সমস্ত দিনই হয়, তবে ক্রমশঃ পরিমাণে কম হয়ে আসে।
৪। পেটে ব্যথা একেবারে থাকে না বাহ্যে অত্যন্ত দুর্গন্ধ।
৫। এতে অনেকটা পরিমাণে এক-এক বারে প্রায় এক-এক কলসী দমকা ভেদ হয়: কিন্তু তাহা হলেও মনে হয় পেট যেন আবার পরিপূর্ণ।
৬। বাহ্যের আগে পেট ডাকে, পেট গড় গড় করে, কাটবমি ও ওয়াকতোলা থাকে।
৭। এক-এক সময়ে বাহ্যে এত বেশী হয় যে, বাহ্যের পর রোগী যেন চুপসে যায়।
৮। শিশু কখনও চোখ অর্দ্ধ নিমীলিত করে নিদ্রা যায় কিম্বা চুপ করে পড়ে থাকে।
৯। বালিসে মাথা চালে, গোঁগায়, কোঁথায়, দাঁত বের হওয়ার সময় শিশু অনবরত মাড়ী কামড়ায়। মোটামুটি-পডোফাইলমের বাহ্যে-পরিমাণে খুব বেশী হয়। পেটে বেদনা থাকে না, অত্যন্ত দুর্গন্ধ এবং বাহ্যে বমি দুইই গরম গ্রীষ্মকালে রোগ বৃদ্ধি হয়।
চিকিৎসা পথ্যঃ
সাধারণতঃ ডায়রিয়া বা উদরাময় হলে বার বার তরল খাবার গ্রহণ করা। যেমনঃ চিড়ার পানি, ডাবের পানি, খাওয়ার স্যালাইন ইত্যাদি।
কী খাবেন না?
-
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
-
অতিরিক্ত তেল বা ঝাল খাবার
-
কাঁচা সবজি বা ফল (যদি ভালোভাবে ধোয়া না হয়)
-
বাইরের বা রাস্তার খাবার
প্রতিরোধের উপায়
-
বিশুদ্ধ পানি পান করুন
-
খাবারের আগে হাত ধুয়ে নিন
-
খাবার ঢেকে রাখুন
-
রান্নার আগে সবজি/মাছ/মাংস ভালোভাবে ধুয়ে নিন
