মায়াজম কি

মায়াজম কি
মায়াজম কি

হোমিওপ্যাথিতে রোগের মূল কারণ খুঁজে বের করার জন্য মায়াজম (Miasm) তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়। হ্যানিমান তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লক্ষ্য করেছিলেন যে, কিছু রোগ বারবার ফিরে আসে বা নিরাময়ের পরেও দেহে কোনো না কোনো সমস্যা রেখে যায়। তিনি এসব গভীরতর কারণকে মায়াজম নামে চিহ্নিত করেন। মূলত চার ধরনের মায়াজম আছে

১। সোরা (Psora)।
২। সিফিলিস (Syphilis)
৩। সাইকোসিস (Sycosis) এবং
৪। টিউবারকুলার (Tubercular)।

সোরা সম্বন্ধে মহাত্মা হ্যানিম্যান বলেছেন, বাইরে যা গলিত কুষ্ঠরূপে প্রকাশ পায় এবং খোস, পাঁচড়া, চুলকানি প্রভৃতি চর্মরোগ যার উন্নত সংস্করণমাত্রা মূলত তা আমাদের মনেরই কুণ্ডয়ন বা সোরা। এই মনঃকুণ্ডয়ন বা সোরা হচ্ছে মানুষের যাবতীয় রোগের একমাত্র কারণ এবং এটি এতো সুগভীর যে এটিকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা প্রায় অসম্ভব এবং জৈব প্রকৃতির তাড়নায় বা সুচিকিৎসার ফলে যদিও কখনও কখনও তাকে বহির্মুখী হয়ে পড়তে দেখা যায় কিন্তু তখন কোনরূপ কুচিকিৎসার সাহায্য পেলে সে পুনরায় অন্তর্মুখী ও জটিল হয়ে দাঁড়ায়।

সোরার কারণঃ

সোরার কারণ বা উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের মতবাদ রয়েছে। কারও মতে সোরা আমাদের কুমনন হতে উৎপন্ন, আবার কারও মতে প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম ইত্যাদি। কিন্তু যদি স্বীকার করা হয় যে সোরা ব্যতীত সিফিলিস বা সাইকোসিস জন্মলাভ করতে পারতো না এবং সোরার সাহায্য বা সঙ্গ ছাড়া সিফিলিস বা সাইকোসিস চিররোগে পরিণত হতে পারতো না, তাহলে প্রশ্ন জাগে যে এই দুইটি যৌন ব্যাধির সাথে সোরার এতো ঘনিষ্ঠতা কেন? তবে কি সোরা বা মনঃকুণ্ডয়ন বলতে যৌন চেতনাকে বুঝায় এবং সেইজন্যই কি মানুষ মোক্ষপথের প্রথম সোপান হিসেবে তার কণ্ঠরোধ করতে চায়-তারই অন্তেষ্টিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে আমাদের সকল সুখ সকল শান্তি? কিন্তু তা তো নাও হতে পারে। সত্যিই যদি এটাই এতো বিষাক্ত, এতো জঘন্য, এতো কুলষিত হতো তাহলে সুনিয়ন্ত্রিত এই বিশাল বিশ্ব তার গর্ভে কখনও মুকুলিত হতে পারতো না।

কিছু কিছু ব্যক্তিগণ সোরার প্রতি কুটিলভাবে কটাক্ষপাত করে আসছেন কিন্তু পাখির কুজন, ফুলের সুরভী, যৌবনের সৌন্দর্য, মিলনের মাধুর্য সবই তো এটিরই অঙ্গরোগ। অসহায় শিশুর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মমতাময়ী মাতার অফুরন্ত মাতৃস্নেহ তারও উৎস তো এইখানে। অতএব সোরা বা মনঃকুণ্ডয়ন বলতে যৌন চেতনাকে বুঝাতে পারে না। তবে যৌনব্যাধির সাথে সোরার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে সেই পথেই সোরার সংজ্ঞা নির্দেশ করা উচিত।

এইজন্য বলা যায় যে, সোরা বা মনঃকুন্ডয়ন বলতে যৌন চেতনাকে না বলে সোরার মদমত্ততা বা বিকৃতি পরিণতি বলাই ভালো হবে। কারণ, সৃষ্টির প্রথম থেকেই যা নারী এবং পুরুষকে দ্বৈতভাবে রূপায়িত করে জীবনকে এমন মধুর রহস্যময় করে তুলেছে তা যৌন চেতনা ছাড়া অন্য কিছু হতেই পারে না। কিন্তু মদমত্ত অবস্থায় সোরার বিকৃত পরিণতি অন্তর্জগতে যে বিপ্লবের সূচনা করে-যে বিশৃঙ্খলা রচনা করে-ধ্বংস তাতে অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।

এইজন্যই মহাত্মা হ্যানিম্যান সোরাকে ধ্বংসের বীজস্বরূপ বলে উল্লেখ করেছেন। এটি যেমন সংক্রামক, তেমনই সুগভীর। এটির ধ্বংসাত্মক প্রভাব হতে নিজেকে রক্ষা করার জন্য জৈব প্রকৃতি যখন বিরোধিতা করতে থাকে তখন তা মনঃকুণ্ডয়নের অবস্থা হতে অবতরণ করে চর্মকুণ্ডয়নে পরিণত হয় বা ভিতর হতে দূরীকৃত হয়ে বাইরে এসে দাঁড়ায়। এই অবস্থায় বাইরে হতে সোরার নির্গমন পথে বাধা দান করলে পুনরায় সে ভিতরে যাওয়ার সুবিধা পায় এবং জৈব প্রকৃতি বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই জন্যই হোমিওপ্যাথিতে বাহ্য প্রয়োগের ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করেছে ঠিকই কিন্তু বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বাহ্যিক প্রয়োগের কথাও বলা হয়েছে। তা হবে স্থান, কাল, পাত্র ভেদে।

কিন্তু শুধু এইটুকুই যথেষ্ট নয়। আমাদের জানা উচিত যে যক্ষ্মার কুচিকিৎসার ফলে উন্মাদ, চর্মক্ষত বা ঘায়ের কুচিকিৎসার ফলে শোথ বা সন্ন্যাস, সবিরাম জ্বরের কুচিকিৎসার ফলে হাঁপানি, পেটের পীড়ার কুচিকিৎসার ফলে বাত বা পক্ষাঘাত, বাত বা স্নায়ুমূলের কুচিকিৎসার ফলে রক্তস্রাব ঘটতে পারে। অতএব হোমিওপ্যাথিতে এই সকল জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।

এখন প্রতিটি মায়াজম সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

এবার আসুন আমরা সোরার সংক্ষিপ্ত পরিচিত, মূল বৈশিষ্ট্য, চারিত্রিক ও মানসিক লক্ষন সম্পর্কে জেনে নিইঃ

১. সোরা (Psora) – চুলকানিজনিত মায়াজম
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

সোরা হলো সবচেয়ে পুরনো এবং প্রাথমিক মায়াজম, যা মূলত চুলকানিজনিত সমস্যার মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে। এটি হোমিওপ্যাথির মূল ভিত্তি, কারণ প্রায় ৭০-৮০% রোগের পেছনে সোরা মায়াজম কাজ করে বলে মনে করা হয়।

মূল বৈশিষ্ট্য:
  • শরীরে বিভিন্ন ধরনের চুলকানি, একজিমা, ফুসকুড়ি বা এলার্জি দেখা যায়।
  • শুষ্ক ত্বক, ফাটা চামড়া, খুশকি বা ত্বকের বিভিন্ন অস্বস্তিকর সমস্যা।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়।
  • পেটের সমস্যা, হজমের দুর্বলতা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা যায়।
  • মনোদৈহিক সমস্যা যেমন— উদ্বেগ, ভয়, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব ইত্যাদি।

সোরার মানসিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যঃ

★★ সোরা মায়াজমের মানসিক ও চরিত্রগত লক্ষণঃ

সোরা মায়াজম শুধু শারীরিক লক্ষণ তৈরি করে না, এটি ব্যক্তির মানসিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। সোরা আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব, দুশ্চিন্তা, ভয় ও মানসিক অস্থিরতা বেশি দেখা যায়।

১. মানসিক লক্ষণঃ
১। উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা:

★ ছোটখাট বিষয়েও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে।

★ ভবিষ্যৎ নিয়ে সবসময় অযৌক্তিক ভয় কাজ করে।

★ সবকিছুতেই সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে।

২। আত্মবিশ্বাসের অভাবঃ

★ নিজের ক্ষমতা ও যোগ্যতা নিয়ে সবসময় সন্দেহ থাকে।

★ সহজে হতাশ হয়ে যায় এবং কাজের আগ্রহ হারায়।

★ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায়, সবসময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকে।

৩। অবসাদগ্রস্ততা ও বিষণ্নতাঃ

★ দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্নতা ও মন খারাপ ভাব বিদ্যমান থাকে।

★ জীবনের প্রতি একধরনের হতাশা কাজ করে।

★ সামাজিকতা এড়িয়ে চলে, একাকিত্ব পছন্দ করে।

৪। ভয় ও আতঙ্কঃ

★ অস্পষ্ট ও অযৌক্তিক ভয় কাজ করে, যেমন— অন্ধকারে থাকা, একা থাকা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়।

★ সামান্য কিছুতেই ভয় পেয়ে যায়, বিশেষত রোগ নিয়ে আতঙ্ক থাকে।

★ মৃত্যু ভয় প্রবলভাবে কাজ করে।

৫। অধৈর্য ও অতিরিক্ত সংবেদনশীলতাঃ

★ সামান্য কিছুতেই মেজাজ হারায় বা মন খারাপ হয়।

★ সহজেই কষ্ট পায়, কান্না চলে আসে।

★ অন্যদের কাছ থেকে ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রত্যাশা করে।

২. চারিত্রিক লক্ষণঃ
১। অলসতা ও কর্মবিমুখতাঃ

★ কোনো কাজ শুরু করতে অনীহা অনুভব করে।

★ কাজ করতে গেলেই একধরনের ক্লান্তি অনুভব করে।

★ সবসময় বিশ্রাম নিতে চাইয়, শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলে।

২। অপরিচ্ছন্নতা ও অব্যবস্থাপনাঃ

★ নিজের পরিচ্ছন্নতা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সম্পর্কে উদাসীন।

★ ঘর-বাড়ি অগোছালো থাকে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে অনীহা।

★ জামাকাপড় ও অন্যান্য জিনিসপত্র অবহেলায় ফেলে রাখে।

৩। অতিরিক্ত সংবেদনশীল ও অসহিষ্ণুঃ

★ সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, সামান্য কথাতেও কষ্ট পায়।

★ অন্যদের আচরণে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়।

★ অন্যদের দোষ ধরতে ভালোবাসে, কিন্তু নিজের ভুল সহজে স্বীকার করে না।

৪। দার্শনিক ও চিন্তাশীল স্বভাবঃ

★ গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকে, অনেক সময় অপ্রাসঙ্গিক বিষয়েও গভীরভাবে ভাবতে থাকে।

★ অতীত স্মৃতির মধ্যে হারিয়ে যায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনায় ডুবে থাকে।

★ অনেক সময় জীবন সম্পর্কে অতিরিক্ত চিন্তা করে, যেন সবকিছু অর্থহীন মনে হয়।

৫। আত্মকেন্দ্রিকতা ও একাকিত্বঃ

★ সামাজিক মেলামেশা পছন্দ করে না, বরং একা থাকতে ভালোবাসে।

★ নিজের সমস্যাগুলো নিয়ে বেশি ভাবতে থাকে, অন্যদের প্রতি কম মনোযোগী হয়।

★ আত্মবিশ্বাসের অভাবে নিজের কথা অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে চায় না।

★★ সোরা (বায়ু) প্রভাব বিস্তার করে মস্তিষ্ক তথা চিন্তাধারার উপর।

★ বায়ুর স্বভাব যেমন চির অঞ্চল, সোরা আমাদের মনকে তেমনই চঞ্চল করে তুলে ক্ষণে ক্রুদ্ধ, ক্ষণে অনুতপ্ত; ক্ষণে উত্তেজিত, ক্ষণে অবসন্ন; সোরার মুখে যেমন অল্পেই হাসি ফোটে, চোখে তেমনই অল্পেই জল দেখা দেয়। পর্যায়ক্রমে কাম ও প্রেম, বৈরাগ্য এবং আসক্তি। সোরার মতো প্রাণ খুলে হাসতে, কাঁদতে, ঝগড়া করতে, বক্-বক্ করতে অন্য কেউই পারে না।

★ কেউ ক্ষমা প্রার্থনা করলে সোরা অবিলম্বে ক্ষমা করে দেয়।

★ সোরার সকল ব্যথা যন্ত্রণাদায়ক বটে কিন্তু তা সবসময় সমানভাবে যন্ত্রণাদায়ক থাকে না। যেমন ফোঁড়া ফেটে গেলেই সোরার যন্ত্রণা কমে যায়। আবার ঋতুস্রাব প্রকাশ পেলে বাধকব্যথার উপশম হয়।

★ সোরা তার খাদ্যদ্রব্য গরম খেতে ভালোবাসে। কিন্তু দুধ সহ্য করতে পারে না।

★ সোরা মিষ্টি খেতে ভালোবাসে।

★ সোরার রোগ যেকোনো সময় বৃদ্ধি পেতে পারে।

★ সোরার রোগাক্রমণ সবদিকে হয়।

★ সোরা স্বপ্নে দেখে প্রস্রাব করছে বা মলত্যাগ করছে অথবা গান গাচ্ছে।

★ সোরা উত্তাপ প্রয়োগে উপশম বোধ করে।

সোরা মায়াজম আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয় এবং এটি তার দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক আচরণে প্রভাব ফেলে। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করলে এসব মানসিক সমস্যা দূর করা সম্ভব।

২। সিফিলিস (Syphilis) – ধ্বংসাত্মক মায়াজম

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

★★ সিফিলিস মায়াজম হলো এক ধ্বংসাত্মক প্রকৃতির রোগ, যা দেহের গঠন ও কোষের অবস্থা পরিবর্তন করে ফেলে। এটি সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং হাড়, স্নাযু ও রক্তবাহিত রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

★★ সিফিলিসের কারণঃ স্পাইকোকীটা এবং গনোকক্কাস।

★★ মূল বৈশিষ্ট্য:

★ ধ্বংসাত্মক প্রকৃতির রোগ যেমন— ক্যান্সার, গ্যাংগ্রিন, আলসার বা পচনজনিত সমস্যা।

★ হাড়ে ব্যথা, সন্ধিতে (joints) সমস্যা, গাঁটে গাঁটে ব্যথা।

★ স্নায়বিক দুর্বলতা, স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা ও মানসিক অবসাদ।

★ রাতে রোগের লক্ষণ বেড়ে যায় এবং রোগী বেশিরভাগ সময় উষ্ণতা চায়।

★★ সিফিলিস মায়াজমের মানসিক ও চারিত্রিক লক্ষণসমূহঃ

হোমিওপ্যাথিতে সিফিলিস মায়াজম (Syphilitic Miasm) একটি গভীর ও ধ্বংসাত্মক প্রকৃতির মায়াজম। এটি মূলত জিনগত, সংক্রামক বা দমন করা রোগের কারণে শরীর ও মনকে প্রভাবিত করে। সিফিলিস মায়াজম বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংসাত্মক পরিবর্তন ঘটায়, যা শারীরিক, মানসিক ও চারিত্রিক দিক থেকে ব্যক্তির মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে।

★★ মানসিক লক্ষণসমূহঃ

সিফিলিস মায়াজম আক্রান্ত ব্যক্তির মন সাধারণত বিষণ্ন, সন্দেহপ্রবণ ও ধ্বংসাত্মক চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকে। এটি মানসিক বিকার ও অস্থিরতার মূল কারণ হতে পারে।

১। হতাশা ও আত্মঘাতী প্রবণতাঃ

★ ব্যক্তি অত্যন্ত বিষণ্ন থাকে এবং জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

★ মনে হয় যেন কেউ তাকে ভালোবাসে না বা সে একা হয়ে গেছে।

★ আত্মহত্যার চিন্তা বারবার আসে, বিশেষত রাতের দিকে।

★ সিফিলিসে প্রায় সর্বদাই মুখ বুজে থাকতে চায় এবং যদি কোনো সময় তাকে মুখ খুলতে হয় বা দেখা যায় তাহলে সে অতি সংক্ষেপে এবং অতি ক্ষিপ্রগতিতে তার কথা শেষ করে ফেলে।

★ সিফিলিসে চিরস্থায়ী স্মৃতি – ভ্রংশ।

★ সিফিলিস যদিও উপদংশ, কিন্তু পিত্তের সাথে সিফিলিসের তুলনা করা হয়েছে বলে বলা যায় যে পিত্ত নিজে যেমন তিক্ত, মনকে সে তেমনই তিক্ত করে তুলে-কোন কাজে তার উৎসাহ আসে না-কোন কাজে সে তৃপ্তি পায় না-সর্বদা নৈরাশ্য, সর্বত্র তিক্ততা ভাব বিরাজ করে।

★ এইরূপ তিক্ততা ও নৈরাশ্যে সিফিলিসের রোগীর বুদ্ধির জড়তা লাভ করে। ফলে সিফিলিসের রোগীর প্রত্যেক কর্ম, প্রত্যেক বাক্য, প্রত্যেক ব্যবহার যেমন রূক্ষ, তেমনই মূর্খের মতো হয়ে যায়।

★ কারও সাথে মেলামেশা করার ক্ষমতাও সিফিলিসের রোগীর থাকে না।

★ অক্ষমতা, নৈরাশ্য এবং তিক্ততয় জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে, ক্রমে আত্মগ্লানি ও বিতৃষ্ণায় সে নিজেকে একদিন শেষ করে ফেলে। শুধু সে নিজেকেই শেষ করে ফেলে, তা নয়, পৃথিবীতে যত নরহত্যাকারী বা খুনী ধরা পড়েছে, সন্ধান নিলে দেখা যাবে তাদের অধিকাংশই সিফিলিটিক। সিফিলিসে নৈরাশ্য, বিতৃষ্ণা, হঠকারিতা ও মূর্খতা প্রবলভাবে দেখা দেয়।

★ ক্ষমা প্রার্থনা করিলে সিফিলিস ক্ষমা করিতে পারে না।

২। সন্দেহপ্রবণতা ও অস্বাভাবিক মানসিকতাঃ

★ চরম সন্দেহবাতিকতা দেখা যায়; ব্যক্তির মনে হতে পারে যে সবাই তাকে প্রতারিত করছে।

★ অনেক সময় সন্দেহ এতটাই তীব্র হয় যে সে ম্যানিয়াতে ভুগতে থাকে।

৩। রাগ ও ধ্বংসাত্মক প্রবণতাঃ

★ সহজেই রেগে যায় এবং অত্যন্ত হিংস্র হতে পারে।

★ কোনো কিছুতে অসন্তুষ্ট হলে ভাঙচুর বা আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে।

★ পরিবারের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

৪। গোপনীয়তা ও বিচ্ছিন্নতাঃ

★ নিজেকে সমাজ ও পরিবারের থেকে আলাদা রাখতে চায়।

★ কারও সাথে কথা বলতে চায় না, বরং একাকিত্ব পছন্দ করে।

★ মনে করে যে কেউ তার কষ্ট বোঝে না।

৫। অপরাধবোধ ও নৈতিক অবক্ষয়ঃ

★ নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়, যদিও তার জন্য কোনো বাস্তব কারণ নাও থাকতে পারে।

★ অন্যদের ক্ষতি করতে পারলে আনন্দ পায় বা অন্যদের দুঃখ দেখে উদাসীন থাকে।

★ নৈতিক মূল্যবোধ কমে যায়, মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা বা নোংরা চিন্তাভাবনা করা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

★★ চারিত্রিক লক্ষণসমূহঃ

★ সিফিলিস মায়াজম আক্রান্ত ব্যক্তির চরিত্রে সাধারণত কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তার আচরণ ধ্বংসাত্মক, রহস্যময় ও অসংলগ্ন হতে পারে।

১। চরমতা ও উগ্রতাঃ

★ চিন্তা, অনুভূতি ও কাজকর্মে চরমভাবাপন্নতা দেখা যায়।

★ হয় একেবারে নির্বিকার ও অলস, নয়তো অত্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল ও অস্থির।

★ কাজ শুরু করলেও শেষ করতে পারে না, বা মাঝপথে একেবারে ছেড়ে দেয়।

২। অনৈতিকতা ও বিকৃত কামনাঃ

★ চরিত্রে অসৎ ও প্রতারক মনোভাব থাকে।

★ অনৈতিক ও বিকৃত যৌন আচরণ প্রকাশ পেতে পারে, যেমন অতিরিক্ত লাম্পট্য বা বিকৃত রুচি।

★ অনেক ক্ষেত্রে পরকীয়া, অবৈধ সম্পর্ক বা যৌন বিকৃতি দেখা যায়।

৩। গোপন অপরাধপ্রবণতাঃ

★ নৈতিকতার বোধ থাকলেও অনেক সময় গোপনে অনৈতিক কাজ করতে পারে।

★ বিশেষ করে মাদকাসক্তি, চুরি, প্রতারণা ইত্যাদির প্রতি আকর্ষণ থাকতে পারে।

★ অপরাধ করার পরও অনুশোচনা থাকে না।

৪। উদাসীনতা ও নির্লিপ্ততাঃ

★ কোনো কিছুর প্রতিই আগ্রহ থাকে না।

★ দাম্পত্য, সামাজিক বা পারিবারিক সম্পর্কের প্রতি উদাসীনতা দেখা যায়।

★ অন্যদের দুঃখ-কষ্টে অনুভূতিহীন হয়ে যায়।

৫। অস্থিরতা ও অনিদ্রাঃ

★ মন সবসময় অস্থির থাকে, এক জায়গায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।

★ রাতে ঘুম হয় না, অথবা দুঃস্বপ্ন দেখে বারবার জেগে ওঠে।

★ মনে হয় কেউ তার ক্ষতি করতে আসছে বা কোনো অদৃশ্য ভয় তাড়া করছে।

★★ সিফিলিসের অন্যান্য লক্ষণঃ

★ সিফিলিস মাখন ও দুধ খেতে ভালোবাসে কিন্তু মাংসে তার অরুচি।

★ সিফিলিস মাদকদ্রব্য পছন্দ করে।

★ সিফিলিস অতিরিক্ত উত্তাপ ও অতিরিক্ত ঠান্ডা কোনোটাই সহ্য করতে পারে না।

★ সিফিলিস সাধারণত শরীরের দক্ষিণদিক আক্রমণ করে।

★ সিফিলিসের বৃদ্ধিকাল রাত্রে অর্থাৎ সূর্যাস্ত হতে সূর্যোদয় পর্যন্ত।

★★ কোন কোন ক্ষেত্রে সিফিলিস প্রয়োগ করা হয়ঃ
★ বধিরতা ★ তোতলামি ★ যকৃতের দোষ ★ অস্থিক্ষত ★ কার্বাঙ্কল ★ ক্যান্সার ★ এপিলেপ্সি (মৃগী) ★ পক্ষাঘাত ★ খর্বাকৃতি ★ ধবল বা শ্বেতী প্রভৃতি ক্ষেত্রে সিফিলিস প্রয়োগ করা হয়।

সিফিলিস মায়াজম শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও চারিত্রিকভাবে একজন ব্যক্তিকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। এটি গভীর বিষণ্নতা, সন্দেহপ্রবণতা, হিংস্রতা ও অনৈতিক আচরণের জন্ম দেয়।

৩. সাইকোসিস (Sycosis) – স্ফীতিজনিত মায়াজম

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

★★ সাইকোসিস মায়াজম হলো এক ধরনের গভীরতর প্যাথোলজিক্যাল অবস্থা, যা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর রোগপ্রবণতা সৃষ্টি করে।

★★ সাইকোসিস মায়াজম কী?

★ সাইকোসিস মায়াজম এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী মায়াজম, যা সাধারণত অতিরিক্ত কোষবৃদ্ধি, গোপনীয়তা, স্ফীততা (hypertrophy), এবং ক্রনিক রোগ সৃষ্টি করে। এটি মূলত *গনোরিয়া* (Gonorrhea) রোগের পরিণতি হিসেবে বিবেচিত, তবে এটি শুধু যৌনরোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যেহেতু সাইকোসিস মায়াজম মূলত গনোরিয়া (Gonorrhea) রোগ থেকে উদ্ভূত হয়। এটি শরীরে অতিরিক্ত বৃদ্ধি ও স্ফীতির সমস্যা তৈরি করে, যেমন— গুটি, টিউমার, ওয়ার্ট (wart) বা অতিরিক্ত মেদ।

মূল বৈশিষ্ট্য:

  • শরীরে অপ্রাকৃত বৃদ্ধি, যেমন— ফোলা ফোলা অনুভূতি, ওয়ার্ট, টিউমার বা চর্বি জমা।
  • গেঁটেবাত (Rheumatism), বাতের ব্যথা বা সংযুক্ত ব্যথা।
  • অনিয়মিত মূত্রত্যাগ ও প্রস্রাবের বিভিন্ন সমস্যা।
  • ঠান্ডায় রোগের উপসর্গ বেড়ে যায়।

★★ সাইকোসিস মায়াজমের প্রধান বৈশিষ্ট্যঃ

১। অতিরিক্ততা (Excessiveness):

★ চামড়ায় বাড়তি স্তর তৈরি হওয়া (wart, mole, callosity)

★ শরীরের কিছু অংশের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি (tumors, polyps, fibroids)

★ স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি।

২। গোপনীয়তা ও দমিত অবস্থাঃ

★ রোগীরা সাধারণত তাদের রোগ বা মানসিক অবস্থা গোপন রাখতে চায়।

★ দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা ও সন্দেহপ্রবণতা দেখা যায়।

৩। নমনীয়তা ও স্থায়িত্বঃ

★ একবার কোনো রোগ শুরু হলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সহজে নিরাময় হয় না।

★ ওষুধ খেলে সাময়িক ভালো লাগে, কিন্তু পুরোপুরি আরোগ্য হয় না।

৪। অতিরিক্ত শ্লেষ্মা ও আর্দ্রতাঃ

★ অতিরিক্ত ঘাম, তৈলাক্ত চামড়া, অথবা ফোলা ফোলা অনুভূতি।

★ বাত বা আর্থ্রাইটিস জাতীয় সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা।

★★ সাইকোসিস মায়াজমের মানসিক বৈশিষ্ট্যঃ

১। সন্দেহপ্রবণতা ও আতঙ্কঃ

★ ব্যক্তির মধ্যে অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতা থাকতে পারে।

★ সবসময় সন্দেহ করা ও অনিশ্চয়তায় ভোগা।

★ ভয় এবং কাউকে বিশ্বাস না করা।

২। আত্মগোপন ও মিথ্যাবাদিতাঃ

★ আবেগপ্রবণতা, মিথ্যা বলা, বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা যায়।

★ নিজের সমস্যাকে লুকানোর প্রবণতা।

★ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কথা বলা বা একদম চুপচাপ থাকা।

★ অতিরিক্ত কল্পনাপ্রবণ ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা।

★ অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের দুর্বলতা লুকানোর চেষ্টা করে এবং আত্মগোপনমূলক জীবনযাপন করে।

৩। অতিরিক্ত ইচ্ছাশক্তি বা লোভঃ

★ অতিরিক্ত কামনা বা সম্পদ জমানোর লোভ।

★ বেশি খাওয়ার প্রবণতা (Gluttony)।

★ খুশির মুহূর্তগুলোও সন্দেহের কারণে উপভোগ করতে না পারা।

৪। মৌলিক নীতির অভাবঃ

★ মিথ্যা বলা বা প্রতারণার প্রবণতা।

★ অতিরিক্ত আত্মগরিমা বা নিজেকে বড় কিছু ভাবা।

৫। অবসাদ ও হতাশাঃ

★ জীবন নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা।

★ মাঝে মাঝে বিষণ্ন হয়ে যাওয়া বা আত্মহত্যার চিন্তা আসা।

★ দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা (Chronic Depression)

★★ শারীরিক লক্ষণঃ

১। অতিরিক্ত বৃদ্ধি ও অস্বাভাবিক গঠনঃ

★ শরীরের কিছু অংশের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি (Hypertrophy)।

★ ত্বকে আঁচিল (Warts), তিল (Moles), পলিপস (Polyps), ও ফাইব্রয়েড (Fibroids) তৈরি হওয়া।

★ স্থূলতা (Obesity) বা শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে যাওয়া।

২। চামড়া ও ত্বকের সমস্যাঃ

★ তৈলাক্ত ত্বক ও অতিরিক্ত ঘাম (Seborrhea)।

★ ত্বকে ফুসকুড়ি, দাগ বা কড়া পড়া।

★ ছোপ ছোপ দাগ বা চামড়ার রঙ পরিবর্তন হওয়া।

৩। সংযোগস্থল (Joint) ও অস্থিরোগঃ

★ বাত (Rheumatism) ও আর্থ্রাইটিস (Arthritis)।

★ হাড়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধি বা বিকৃতি (Bone Deformities)।

★ দীর্ঘস্থায়ী পিঠ, কোমর ও হাঁটুর ব্যথা।

৪। স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যাঃ

★ মাথা ভারী লাগা, ঝিমঝিম অনুভূতি।

★ ঘুমের সমস্যা বা দুঃস্বপ্ন দেখা।

★ দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা।

৫। পাচনতন্ত্র ও মেটাবলিজমের সমস্যাঃ

★ খাবার হজমে সমস্যা ও গ্যাস্ট্রিক।

★ লিভারের সমস্যা ও অতিরিক্ত শ্লেষ্মা উৎপাদন।

★ কোষ্ঠকাঠিন্য বা পাইলস।

৬। প্রজনন ও হরমোনজনিত সমস্যাঃ

★ PCOS, বন্ধ্যাত্ব, বা মাসিকের অনিয়ম।

★ প্রস্টেট গ্রন্থির সমস্যা।

★ যৌন উত্তেজনা বেশি বা একেবারে কমে যাওয়া।

★★ সাইকোসিসের ক্রিয়া (কফ) অন্ত্র ও সন্ধিপথে।

★★ সাইকোসিস কথা বলে চিবিয়ে চিবিয়ে ধীরে ধীরে এবং ক্ষণে ক্ষণে ভুলে যায় কি বলতেছিলো।

★★ সাইকোসিস সন্দিগ্ধ, শঙ্কিত ও গোপনপ্রিয়।

★★ কেউ ক্ষমা চাইলে সাইকোসিস ক্ষমা করতে ইতস্তত করতে থাকে এবং শর্ত আরোপ করতে থাকে।

★★ হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে সাইকোসিস বারম্বার মিলিয়ে দেখতে থাকে এবং নির্ভুল হলেও সংশয় থেকে যায়।

★★ খাদ্যঃ সাইকোসিস তার খাদ্যদ্রব্য অল্প ঠান্ডা বা অল্প গরম খেতে ভালোবাসে কিন্তু মাখন বা চর্বিযুক্ত খাদ্য সহ্য করতে পারে না।

★★ সাইকোসিস লবন প্রিয়।

★★ বৃদ্ধিঃ সাইকোসিসের বৃদ্ধিকাল পূর্বাহ্নে বা অপরাহ্নে অর্থাৎ বেলা ৩টা বা রাত্রি ৩টা।

★★ উপশমঃ সাইকোসিসের প্রদাহ হলে নড়াচড়া করতে ভালোবাসে।

★★ আক্রমনঃ সাইকোসিস সাধারণত শরীরের বামদিকে আক্রমণ করে।

★★ স্বপ্নঃ সাইকোসিস স্বপ্ন দেখে উড়ে যাচ্ছে বা পড়ে যাচ্ছে।

★★ সাইকোসিস মায়াজম সম্পর্কিত রোগসমূহঃ
সাইকোসিস মায়াজম থেকে সৃষ্টি হওয়া কিছু সাধারণ রোগ হলো
ত্বকের রোগ: 

– Warps, moles, psoriasis, eczema 

✅ সন্ধি ও হাড়ের রোগ:

– গেঁটে বাত, হাড়ের বৃদ্ধি, ফ্রোজেন শোল্ডার।

✅ স্নায়বিক সমস্যা:

  – মাথা ঘোরা, স্মৃতিভ্রংশ।

✅ উর্বরতা ও প্রজননজনিত সমস্যা:

  – PCOS; অর্থাৎ পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম। এটি একটি হরমোনজনিত অবস্থা যা প্রজননশীল মহিলাদের প্রভাবিত করে, বন্ধ্যাত্ব, ফাইব্রয়েড।

অতিরিক্ত ওজন ও বিপাকজনিত রোগ: 

– স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ।

★★ কোথায় কোথায় সাইকোসিস বর্তমান থাকেঃ

১। হিষ্টিরিয়া। ৭। ডিপথিরিয়া। ১৩। সায়াটিকা ইত্যাদি প্রদাহ।
২। হাঁপানি। ৮। বসন্ত। ১৪। টাইফয়েড।
৩। স্ট্রিকচার (মূত্রনালীর সঙ্কীর্ণতা)। ৯। ভ্যাজাইনিসমাস (যোনিকপাট রুদ্ধ হয়ে যায়)। ১৫। টিউমার।
৪। মূত্রপাথরি। ১০। ব্লাড প্রেসার (রক্তের চাপবৃদ্ধি)। ১৬। ছানি।
৫। একশিরা। ১১। সন্ন্যাস। ১৭। বাধক বা ঋতুকষ্ট।
৬। ফাইলেরিয়া। ১২। বাত। ১৮। ক্রনিক আমাশয় প্রভৃতির মূলে সাধারণত সাইকোসিস বর্তমান থাকে।

★★ সাইকোসিসের অন্যান্য কথাঃ

কফ বা সাইকোসিস শরীরের অন্ত্র ও সন্ধিপথে প্রভাব বিস্তার করে বলে সাইকোসিস মূত্রনালী, শ্বাসনালী, বৃহদান্ত্র, সরলান্ত্র এবং সন্ধিস্থলে স্বাভাবিক ক্রিয়ায় বাধাদান করে। এসব স্থানের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করে এবং সংকোচিত করে ফেলার চেষ্টা করে ফলে গেঁটে বাত, মূত্রকষ্ট, হাঁপানি ইত্যাদি উপসর্গে রোগী নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করে।

যন্ত্রণা বেশি হওয়ায় রোগীর প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু প্রান সহজে যায় না রোগী শুধু যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকে।। যেমনঃ ঋতুস্রাব প্রকাশ পেলে ঋতুস্রাবের সাথে ব্যথা সমানভাবে বর্তমান থাকে অথবা তা বৃদ্ধি পায়।

সাইকোসিস মায়াজম সাধারণত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয় এবং ধীরে ধীরে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী রোগ সৃষ্টি করে। এটি শুধুমাত্র শারীরিক সমস্যা নয়, বরং মানসিক ও আবেগগত সমস্যারও কারণ হতে পারে। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তবে সঠিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

৪. টিউবারকুলার (Tubercular) – দুর্বলতা ও অস্থিরতাজনিত মায়াজম

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

টিউবারকুলার মায়াজম মূলত যক্ষ্মা (Tuberculosis) রোগের সাথে সম্পর্কিত। এটি শরীরকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে ফেলে এবং রোগীর মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

মূল বৈশিষ্ট্য:
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই দুর্বল, বারবার ঠান্ডা-জ্বর হয়।
  • শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, অপুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা দেয়।
  • রোগী সবসময় এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না, এক কাজ বেশিদিন করতে চায় না।
  • শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, কাশি ও ফুসফুসের সমস্যা দেখা দেয়।
  • শরীরে চর্বি কম থাকে এবং রোগী বেশি ক্ষুধার্ত অনুভব করে।

★★ টিউবারকুলার মায়াজম হলো চারটি প্রধান মায়াজমের (সোরিক, সাইকোটিক, সিফিলিটিক ও টিউবারকুলার) মধ্যে একটি, যা যক্ষ্মা বা টিউবারকুলোসিস (TB)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

★★ টিউবারকুলার মায়াজম কী?

টিউবারকুলার মায়াজম হলো এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী, গভীরভাবে প্রোথিত শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা, যা যক্ষ্মার সংক্রমণ বা তার বংশগত প্রভাবের ফলে শরীরে বিকশিত হয়। এটি শরীরকে দুর্বল করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে ব্যক্তির মধ্যে নানা ধরনের সংক্রমণ, অস্থিরতা ও অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায়।

★★ টিউবারকুলার মায়াজমের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যঃ

১. শারীরিক লক্ষণঃ

★ বারবার ঠান্ডা লাগা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট।

★ শারীরিক গঠন সাধারণত চিকন, লম্বাটে এবং দুর্বল।

★ হাড় ও সংযোগস্থলে ব্যথা।

★ ঘন ঘন জ্বর, বিশেষ করে বিকেলের দিকে।

★ অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্ত হয়ে যাওয়া।

★ ক্ষুধামন্দা বা কখনো অত্যধিক ক্ষুধা।

★ চামড়ার বিভিন্ন সমস্যা (একজিমা, ফুসকুড়ি, চুলকানি ইত্যাদি)।

★ দাঁত দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়া।

★ শিশুদের ক্ষেত্রে বিকাশজনিত সমস্যা, যেমন দেরিতে হাঁটা বা দাঁত গজানো।

২. মানসিক লক্ষণঃ

★ চঞ্চলতা ও অধৈর্যতা।

★ একঘেয়েমি ও পরিবর্তনের প্রতি আকর্ষণ।

★ হতাশা ও দুশ্চিন্তা।

★ আত্মবিশ্বাসের অভাব বা উল্টো মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।

★ নতুন নতুন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার প্রবণতা।

★ মনের অস্থিরতা ও বারবার পেশা পরিবর্তনের প্রবণতা।

★★ টিউবারকুলার মায়াজমের কারণঃ

বংশগত প্রভাবঃ যদি পরিবারের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যক্ষ্মা থাকে, তাহলে বংশধরদের মধ্যেও টিউবারকুলার মায়াজমের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

অপুষ্টি ও দূষণঃ অপুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব, দূষিত পরিবেশে বসবাসের কারণে এই মায়াজম সক্রিয় হতে পারে।

সংক্রমণঃ যদি কেউ দীর্ঘ সময় যক্ষ্মার সংস্পর্শে থাকে, তবে তার শরীরে এই মায়াজম তৈরি হতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী রোগ ও দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতাঃ শিশুদের ক্ষেত্রে ঘন ঘন জ্বর, ইনফেকশন এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এই মায়াজমের উত্থান ঘটাতে পারে।

★★ জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও প্রতিরোধ ব্যবস্থাঃ

★ পুষ্টিকর খাবার খাওয়া (প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিনসমৃদ্ধ খাদ্য)।

★ পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও নিয়মিত ব্যায়াম।

★ দূষণমুক্ত পরিবেশে বসবাস।

★ পর্যাপ্ত রোদ পাওয়া (ভিটামিন D-এর জন্য)।

★ মানসিক চাপ কমানোর জন্য মেডিটেশন বা যোগব্যায়াম।

টিউবারকুলার মায়াজম শুধু শারীরিক দুর্বলতার কারণ নয়, এটি মানসিক ও আবেগগত দিক থেকেও ব্যক্তিকে দুর্বল করে তোলে। তবে সঠিক সময়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

উপসংহার

হোমিওপ্যাথির মায়াজম তত্ত্ব রোগের গভীর কারণ নির্ণয় করে এবং মূল থেকে রোগ নিরাময়ের পথ দেখায়। সোরা, সিফিলিস, সাইকোসিস এবং টিউবারকুলার—এই চারটি মায়াজম মানবদেহে বিভিন্নভাবে কাজ করে এবং নানা রোগ সৃষ্টি করে। সঠিক ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে এগুলোকে নিরাময় করা সম্ভব। তাই কোনো দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ফিরে আসা রোগ থাকলে, একজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এক কথায় বলা যায় যে, সোরা বায়ু, সিফিলিস পিত্ত এবং সাইকোসিস কফ এর উপর প্রভাব বিস্তার করে।ইনফোগ্রাফি কী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top