ডায়াবেটিস কি

ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিস, যা সাধারণত ডায়াবেটিস মেলিটাস নামে পরিচিত, একটি দীর্ঘস্থায়ী বিপাকীয় রোগ যেখানে রক্তে শর্করার (গ্লুকোজ) মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। আমাদের শরীর যখন পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না অথবা যে ইনসুলিন তৈরি করে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না, তখন এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। ইনসুলিন হলো অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত একটি হরমোন, যা রক্ত থেকে গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে, যেখানে এটি শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ডায়াবেটিস কেন হয়?

ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে, যা মূলত ডায়াবেটিসের প্রকারভেদের ওপর নির্ভর করে।

টাইপ ১ ডায়াবেটিস:

এটি একটি স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Autoimmune disease) জনিত রোগ। এক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে (বিটা কোষ) ধ্বংস করে দেয়। ফলে শরীর একেবারেই ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। এটি সাধারণত অল্প বয়সে বা কৈশোরে দেখা যায়, তবে যেকোনো বয়সেই হতে পারে। এর সঠিক কারণ এখনো অজানা, তবে জেনেটিক এবং পরিবেশগত কারণের সমন্বয়ে এটি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস:

এটি ডায়াবেটিসের সবচেয়ে সাধারণ প্রকার। এক্ষেত্রে শরীর হয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না অথবা ইনসুলিনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না (যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স নামে পরিচিত)। টাইপ ২ ডায়াবেটিসের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন: অতিরিক্ত ওজন ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের একটি বড় কারণ।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট গ্রহণ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
জেনেটিক প্রবণতা: পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
বয়স: বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরল: এই সমস্যাগুলো ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes): এটি গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে দেখা যায়, যখন শরীর গর্ভাবস্থায় ইনসুলিনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। সাধারণত প্রসবের পর এটি সেরে যায়, তবে যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়, পরবর্তীত টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

ডায়াবেটিসের লক্ষণ কি কি?

ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো প্রায়শই ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং অনেক সময় unnoticed থেকে যায়। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে যা দেখে ডায়াবেটিসের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে:

ঘন ঘন প্রস্রাব (বিশেষ করে রাতে): রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ কিডনির মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টার কারণে এমন হয়।
অতিরিক্ত তৃষ্ণা: ঘন ঘন প্রস্রাবের কারণে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ে, ফলে তৃষ্ণা পায়।
অতিরিক্ত ক্ষুধা: শরীর গ্লুকোজকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারায় কোষগুলো ক্ষুধার্ত থাকে।
ক্লান্তি বা দুর্বলতা: কোষগুলো পর্যাপ্ত শক্তি না পাওয়ায় শরীর দুর্বল ও ক্লান্ত অনুভব করে।
অকারণে ওজন হ্রাস (বিশেষ করে টাইপ ১ ডায়াবেটিসে): শরীর যখন গ্লুকোজকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না, তখন ফ্যাট এবং পেশী থেকে শক্তি গ্রহণ শুরু করে।
দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া: রক্তের উচ্চ শর্করার মাত্রা চোখের লেন্সকে প্রভাবিত করতে পারে।
ধীরে ক্ষত শুকানো: উচ্চ রক্তে শর্করা রক্ত ​​সঞ্চালন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, ফলে ক্ষত সারতে দেরি হয়।
ত্বকের শুষ্কতা এবং চুলকানি: উচ্চ রক্তে শর্করা ত্বককে শুষ্ক করে তোলে।
বারবার সংক্রমণ: বিশেষ করে মূত্রনালীর সংক্রমণ, ত্বকের সংক্রমণ এবং ইস্ট ইনফেকশন (যেমন ক্যানডিডিয়াসিস)।
হাতে বা পায়ে ঝিনঝিন করা বা অসাড়তা: এটি ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির লক্ষণ হতে পারে, যা স্নায়ুর ক্ষতির কারণে ঘটে।

যদি এই লক্ষণগুলোর কোনোটি আপনার মধ্যে দেখা যায়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রাথমিক অবস্থায় ডায়াবেটিস শনাক্ত হলে এর জটিলতাগুলো প্রতিরোধ করা সহজ হয় এবং একটি সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব হয়।

What is Pixel

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top